শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৫ পূর্বাহ্ন
এস.এম. সাঈদুর রহমান সোহেল॥ ‘ওয়ে মৃত্যু তুমি মোরে কি দেখাও ভয়, ও ভয়ে কম্পিত নয় আমার হৃদয়’ বাঙ্গলার ওমর কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার এভাবেই মৃত্যুকে আপন করে আলিঙ্গন করেছেন। প্রখ্যাত এ কবির জন্মস্থান খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে। ১১০ বছর আগে বাঙ্গলা ১৩১৩ সালের পৌষে তিনি ইহজগত ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। কবির স্মৃতি রক্ষার্থে মন্দিরের জন্য নিজ পুত্রের দানকৃত জমি এখন চলে গেছে অবৈধ দখলে। মন্দিরটি ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকলেও মন্দিরের ভাষাণ ঘাটে (প্রতিমা ভাসানোর ঘাট) তৈরি করা হয়েছে পাকা স্থাপনা। স্থানীয় ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে একটি চক্রকে মূল্যবান এ জমি ডিসিআরের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে মন্দিরের জমি অবৈধ দখলে থাকলেও মুক্ত করার কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি অবৈধ দখলে যাওয়া জমিতে নির্মাণকৃত ভবনের অংশ বিশেষও অপসারণ করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জমি দখল হওয়ায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমনকি, ওই মন্দির কেন্দ্রিক পূজা অর্চনা এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও সঠিকভাবে পালন করতে পারছেন না তারা। অবিলম্বে অবৈধ দখলমুক্ত এবং নির্মাণাধীন স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। তবে, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। সেনহাটি শিববাড়ী পুজা মন্দির পরিচালনাকারী সংগঠন হিন্দু সমাজ কল্যান পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক বরাবর দাখিলকৃত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বাঙ্গলার অমর কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের পুত্র উমেশ চন্দ্র মজুমদার কবির স্মৃতি রক্ষার্থে শিববাড়ী মন্দিরের জন্য সেনহাটি মৌজার ৪টি দাগে ৭০ শতক জমি দান করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় মহিলা সমিতির পক্ষ থেকে সেখানে কৃষ্ণ চন্দ্র ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য নামফলক উন্মোচন করা হয়। ওই জমিতে ১৩৪৯ সালে স্থানীয় নারী সরোজিনী দেবী তার স্বামী রায় কুমুদ বন্ধু দাশ শর্মা বাহাদুরের নামে মন্দির ভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে ৮০ দশকে মন্দিরের সম্পত্তি প্রথম দফায় অবৈধ দখলে চলে যায়। এ বিষয়ে অভিযোগ করা হলে তৎকালীন জেলা প্রশাসকের তদন্তে অবৈধ দখলের বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে মন্দিরের অনুকূলে রায় প্রদান করেন। অবৈধ দখলমুক্ত হলে তখন থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ওই মন্দিরে পূজা অর্চনা করে আসছে।
এদিকে, ২০১৬ সালের দিকে আবারও একটি চক্র উপজেলা ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে মন্দিরের ১১৭৯ দাগের ৪ শতক জমি নিজেদের নামে ডিসিআর মারফত বরাদ্দ নেয়। এর মধ্যে সেনহাটি গ্রামের মৃত আব্দুস সালাম খাঁনের ছেলে চঞ্চল খাঁন তিন শতক এবং একই এলাকার আব্দুল ওহাব এক শতক জমি বরাদ্দ নেন। এরপর ভৈবর নদ সংলগ্ন মন্দিরের ভাষাণ ঘাটে চঞ্চল খাঁন পাকা স্থাপনা নির্মাণ শুরু করেন। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষ্নুপদ পালকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি তদন্ত প্রতিবেদনও দাখিল করেন। বিষয়টি ওই পর্যন্তই রয়েছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে স্থানীয় হিন্দু সমাজ কল্যান পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সৌমিত্র দত্ত এ প্রতিবেদককে বলেন, তারা মন্দিরের জমি দখলমুক্ত করার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করার পর বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তদন্তের নামে সময় ক্ষেপন করে। ফলে মন্দিরের জমি এখনও অবৈধ দখল মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এমনকি সেখানে পূজা অর্চনা এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে অবৈধ দখলমুক্ত এবং নির্মাণাধীন স্থাপনা উচ্ছেদে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ ব্যাপারে খুলনার জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান বলেন, কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের জমিসহ সকল স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হবে। অবৈধ দখল প্রসঙ্গে বলেন, দখলের বিষয়টি তিনি সরেজমিনে দেখেছেন, সেখানে কয়েকটি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।